হিজরি ক্যালেন্ডার বা আরবি বর্ষপঞ্জি মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য ঐতিহ্য। এটি কেবল তারিখ গণনার মাধ্যম নয়, বরং এটি মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদত, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যেখানে আমরা ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, সেখানে আরবি মাসের নাম এবং এর গুরুত্ব জানা আমাদের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে আরবি মাসগুলোর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও ইবাদত মূলত আরবি বা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে দৈনন্দিন অনেক কার্যক্রমও এই পঞ্জিকার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষ এখনো আরবি মাসগুলোর নাম সঠিকভাবে জানেন না। আজকের এই লেখা থেকে আমরা আরবী ১২ মাসের নাম কি কি তা জানবো। এছাড়া আরবিতে ও ইংরেজিতে এই নামগুলো কেমন হয় তাও দেখবো।
আরবী ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের ইতিহাস
ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি ক্যালেন্ডারের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.) এর শাসনামলে এই ক্যালেন্ডারের আনুষ্ঠানিক প্রবর্তন করা হয়।
এই ক্যালেন্ডারটি মূলত প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত। মহানবীর এই ঐতিহাসিক যাত্রাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘হিজরত’ বলা হয়। এই হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামি দাওয়াত ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল, যার সম্মানার্থেই এই সনের নাম রাখা হয়েছে ‘হিজরি সন’।
খলিফা হজরত ওমর (রা.) যখন নতুন একটি বর্ষপঞ্জি চালুর সিদ্ধান্ত নেন, তখন সাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করে মহরম মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকেই সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ মহরম মাসের এক তারিখকে ইসলামি নববর্ষের শুরু হিসেবে পালন করে আসছে।

আরবি ১২ মাসের নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
আরবি বারোটি মাসের নাম এবং প্রতিটি মাসের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। নিচে নামগুলোর সাথে এগুলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হলোঃ
-
মহরম
এটি হিজরি সনের প্রথম মাস। ইসলামে যে চারটি মাসকে সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, মহরম তার মধ্যে অন্যতম। এই মাসের ১০ তারিখে ‘আশুরা’ পালিত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
-
সফর
সফর আরবি বছরের দ্বিতীয় মাস। প্রাচীন আরবে এই মাস নিয়ে কিছু কুসংস্কার থাকলেও ইসলাম সেগুলোকে নাকচ করে দিয়েছে। এটি মূলত কাজের ও প্রস্তুতির মাস হিসেবে পরিচিত।
-
রবিউল আউয়াল
ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর একটি। এই মাসের ১২ তারিখে মানবতার মুক্তিদূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং একই তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। ফলে বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা এই মাসকে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে পালন করেন।
-
রবিউস সানি
এটি রবিউল আউয়ালের পরবর্তী মাস। আধ্যাত্মিক সাধকদের কাছে এই মাসটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
-
জমাদিউল আউয়াল
এই মাসের নামের সাথে আরবের শুষ্ক আবহাওয়া ও শীতের শুরু বা বরফ জমার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
-
জমাদিউস সানি
এটি জমাদিউল আউয়ালের পরবর্তী মাস। এই মাসেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধর্মীয় ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
-
রজব
এটি আরও একটি সম্মানিত বা নিষিদ্ধ মাস। এই মাসকে আল্লাহর মাস বলা হয়। রজব মাসের ২৭ তারিখে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক ‘মেরাজ’ সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে তিনি আল্লাহর দিদার লাভ করেছিলেন এবং উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উপহার নিয়ে এসেছিলেন।
-
শাবান
শাবান মাস হলো বরকতময় রমজান মাসের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। এই মাসের ১৫ তারিখে পালিত হয় ‘লাইলাতুল বরাত’ বা শবে বরাত, যা ভাগ্য রজনী হিসেবে পরিচিত।
-
রমজান
আরবি মাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানিত মাস। এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। পুরো মাসজুড়ে মুসলিমরা রোজা রাখেন এবং শেষ দশ দিনের কোনো এক বিজোড় রাতে ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর তালাশ করেন, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
-
শাওয়াল
রমজানের সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের ১ তারিখে পালিত হয় মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘ঈদুল ফিতর’। এই মাসে ৬টি নফল রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
-
জিলকদ
এটি জিলহজ বা হজের মাসের আগের মাস। এটিও চারটি সম্মানিত মাসের অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীনকালে আরবরা এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ রেখে হজের প্রস্তুতি নিত।
-
জিলহজ
হিজরি বছরের সর্বশেষ এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ মাস। এই মাসেই মুসলিমরা পবিত্র কাবা শরিফে হজ পালন করেন। ১০ই জিলহজ পালিত হয় ঈদুল আজহা বা কুরবানি। এই মাসের প্রথম দশ দিন ইবাদতের জন্য অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ সময়।
আরো দেখুনঃ আল্লাহর ৯৯ নাম আরবি ও বাংলা অর্থ সহ pdf
আরবি ১২ মাসের নাম আরবিতে
আরবি মাসগুলোর ব্যবহার আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোতেই মূলত বেশি প্রচলিত। আমাদের দেশে সাধারণত আরবি মাসগুলো বাংলা বা উচ্চারণভিত্তিক নামে ব্যবহৃত হয়, আরবিতে লেখার প্রচলন তুলনামূলকভাবে কম। তবে যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন এবং আরবি ভাষায় মাসগুলোর নাম মুখস্থ রাখতে আগ্রহী, তাদের সুবিধার্থে নিচে আরবি মাসগুলোর নাম আরবি লিপিতে উপস্থাপন করা হলোঃ
- محرم
- صفر
- ربيع الاول
- ربيع الثاني
- جمادى الاول
- جمادي الثاني
- رجب
- شعبان
- رمضان
- شوال
- ذي القد
- ذي الحج
আরবি মাসগুলো মনে রাখার সহজ উপায় হলো প্রতিদিনের ক্যালেন্ডারে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি আরবি তারিখটিও একবার দেখে নেওয়া। এতে খুব অল্প সময়েই বারোটি মাস আপনার আয়ত্তে চলে আসবে।
আরবি ১২ মাসের নাম ইংরেজিতে
আমাদের দেশে সাধারণত আরবি মাসগুলো ইংরেজিতে খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। বরং ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে আরবি মাসের ইংরেজি নাম বেশি প্রচলিত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। তাই যারা ইংরেজিতে আরবি মাসগুলোর নাম জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য আমাদের এই তালিকাটিঃ
- Moharra
- Sofor
- Robiul Awal
- Rabius Sani
- Jamadiul Awal
- Jamadius Sani
- Rajab
- Shaban
- Ramjan
- Shawal
- Jelkad
- Jilhaj
শেষ কথা
একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রত্যেকেরই আরবি বা হিজরি সালের বারোটি মাসের নাম জানা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সাধারণত রমজান মাসের কথাই সবচেয়ে বেশি মনে রাখি। কারণ এই মাসে রোজা ফরজ হয়, কোরআন নাজিল হয়েছে এবং শবে কদরের মতো মহিমান্বিত রজনী রয়েছে। কিন্তু শুধু রমজান মাস জানাই যথেষ্ট নয়। রমজানের আগের মাস শাবান এবং পরের মাস শাওয়ালও ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাবান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন এবং রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। অন্যদিকে শাওয়াল মাসে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয় এবং ছয়টি নফল রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের শুধু রমজান নয়, বরং হিজরি সালের প্রতিটি মাসের নাম, ক্রম ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা রাখা উচিত।
